
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি : নদীবেষ্টিত জেলা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ। প্রধান নদী যমুনাসহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদী একসময় ছিল এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। দীর্ঘদিনের খরা ও নদীর নাব্যতা হ্রাসসহ নদী ভরাট এবং শাখা নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে নদীগুলো হারিয়েছে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ। এতে নদীতে মাছ ধরা বন্ধের উপক্রমে জেলে ও নৌ-শ্রমিকসহ নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। এদিকে, নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় শুধু জেলে বা নৌ-শ্রমিকরাই নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র ত্রাণ দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদী খনন ও সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের বিশাল এক জনগোষ্ঠী স্থায়ীভাবে জীবিকা হারাবে। একারণে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত খনন ও খাল পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বুধবার (১১ মার্চ) সকালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যমুনার বুক জুড়ে জেগে ওঠা হাজার হাজার একর জমিতে স্থানীয়রা বিভিন্ন ফসলের আবাদ করছেন। উৎপাদন বাড়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটলেও চরম বিপাকে পড়েছেন নৌ-শ্রমিক ও জেলেরা। একসময় ভরা নদীতে নৌকা চালিয়ে ও মাছ ধরে যারা সংসার চালাতেন, তারা এখন কাজ হারিয়ে দিশেহারা। নদীতে পানি না থাকায় অনেকেই তাদের শেষ সম্বল নৌকা ও জাল বিক্রি করে দিয়েছেন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই দাদন ব্যবসায়ী ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। জীবন বাঁচাতে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অনেকেই কাজের সন্ধানে শহরসহ ঢাকামুখী হয়েছে।শহর ও ঢাকায় গিয়ে কেউ রিকশা-ভ্যান, কেউ সিএনজি, গার্মেন্টস, ট্রাক-বাসের হেলপার, আবার কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় যমুনা, ইছামতি, হুরাসাগর, বাঙালি, বড়াল, করতোয়া, ফুলজোরসহ প্রায় ১৩টি উল্লেখযোগ্য নদী রয়েছে। এসব নদীর বেশিরভাগই যমুনা নদীর শাখা বা উপনদী হিসেবে পরিচিত। জেলায় স্থায়ী মৎস্যজীবীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৮৭৩ জন।
এছাড়া মৌসুমি মৎস্যজীবী রয়েছে প্রায় ৫ হাজার। সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালি ও শাহজাদপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদী এবং তাড়াশ ও উল্লাপাড়ায় চলনবিলে একসময় এসব নদীতে সারা বছর পানি প্রবাহ থাকলেও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পলি জমে বর্তমানে অনেক নদী ও খালের বিভিন্ন অংশে চর জেগে উঠেছে। কোথাও কোথাও নদ-নদী, খাল-বিল প্রায় শুকিয়ে গেছে। এ কারণে অনেক স্থানে কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করছে।
কাজিপুরের নাটুয়ারপাড়া চরের জেলে নিমাই দাঁস বলেন, আগে প্রতিদিন নদীতে নামলে ভালো মাছ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন জাল ফেলেও তেমন মাছ পাওয়া যায় না। নদীতে অনেক চর জেগে উঠায় পানি না থাকায় মাছের দেখা মিলছে না। একারণে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চরের জেলে মালেক শেখ বলেন, নদীতে চর পড়ায় এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করা ছাড়া উপায় নেই। নদীতে মাছের দেখা না পেয়ে অনেক জেলেরা শহর ও ঢাকায় গিয়ে অন্য কাজ করে কোন রকম সংসার চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, নৌ-শ্রমিকদের অবস্থাও একই রকম দুর্দশার। নদীতে নাব্যতা কমে যাওয়ায় অনেক নৌপথে নৌকা চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন বহু মাঝি ও নৌ-শ্রমিক।
শহরের মতি সাহেবের ঘাটের মাঝি রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলার প্রধান নদী যমুনা ও তার শাখা নদীগুলোতে পানি কমে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছি। দীর্ঘদিনের খরা ও নদীর নাব্যতা হ্রাসের অনেক জায়গায় চর পড়েছে। একারণে নদীপথে নৌকা চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুম আসার আগেই নদী শুকিয়ে যায়। কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
চৌহালী উপজেলার অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন এই উপজেলা থেকে অগণিত মানুষ জেলা শহরে যাতায়াত করে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরাঞ্চলের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন যমুনা হয়ে লেখাপড়া করতে যায়। কিন্তু জেগে ওঠা ডুবো চরের কারণে একদিকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অন্যদিকে নদী পার হতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে তাদের কর্মঘণ্টা।
চৌহালী থেকে শহরে কোর্টে আসা সবুজ আকন্দ বলেন, মামলা জনিত কারণে মাঝে মধ্যেই সিরাজগঞ্জ কোর্টে আসতে হয়। চৌহালী থেকে এনায়েতপুর নৌঘাট হয়ে জেলা সদরে আমাদের যাতায়াতে করতে হয়। যমুনা নদীতে এখন পানি না থাকায় শ্যালো নৌকায় কয়েক কিলোমিটার ঘুরে চৌহালী থেকে এনায়েতপুর নৌঘাট হয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে ১ ঘণ্টার বদলে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় বেশি লাগে। দেরি করে কোর্টে আসলে কোনো কাজই হয় না। তাই একদিন আগে এসে শহরে একটি হোস্টেলে ৫শ টাকা রুম ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়। এতে আমাদের একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে। তেমনি খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
এনায়েতপুর নৌকা ঘাটের ইজারাদার ইউসুফ আলী জানান, যেভাবে নদীর পানি কমছে, তাতে নৌকা চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এখন ড্রেজিং করে নৌপথ তৈরি করা না হলে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে জেলা সদরের সঙ্গে নৌপথের চৌহালীসহ বিভিন্ন স্থানের যাবতীয় কর্মকাণ্ড স্থরিব হয়ে পড়বে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৎস্যজীবীদের ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য ভিজিএফ কার্ড প্রদানের লক্ষে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং দ্রুত তাদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হবে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান বলেন, নদী খনন ও নাব্যতার বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএ-র আওতাধীন। তারাই এ ব্যাপারে কি করণীয় বলতে পারবে। আমরা শুধু ভাঙনের বিষয়টি দেখি।
সিরাজগঞ্জ বিআইডব্লিউটি-এর যুগ্ম-পরিচালক ক্যাপ্টেন জি.এ.এম আলী রেজা বলেন, অনেক স্থানে ড্রেজিংয়ের কাজ করা হয়েছে। নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলে জেলার অনেক জায়গায় খননের কাজ শুরু করা হবে।
- Latest Posts by বর্তমান বাংলাদেশ ডেস্ক
-
গাজীপুরের আলোচিত ঝর্ণা হত্যা: আসামির বয়স জালিয়াতি করে কিশোর সাজানোর চেষ্টা
- -
“উদ্ভাবন সুরক্ষায় মেধাস্বত্ব অপরিহার্য” — গাকৃবি ভিসি
- -
পঞ্চগড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আইনজীবী সোলেমান হক নিহত
- All Posts
