গাজীপুর সদর উপজেলায় ডাকাতির মহোৎসব

রোকুনুজ্জামান খান
বিশেষ প্রতিনিদি

print news

>> দিন-রাতে নিরাপত্তাহীনতায় আতঙ্কিত জনজীবন, টহল ও জনবল সংকটে পুলিশ

গাজীপুর সদর উপজেলায় একের পর এক সংঘবদ্ধ ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় এলাকাজুড়ে ভয় ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত এক মাসের মধ্যে সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি দিনের বেলাতেও বেড়েছে চুরি-ছিনতাই। ফলে রাতের ঘুম যেমন ছুটছে, দিনের চলাফেরাতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এদিকে পুলিশ বলছে থানায় জনবল কম থাকায় সব এলাকায় একসঙ্গে টহল জোরদার করা যাচ্ছে না।

গত মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) গভীর রাতে সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামে বিএনপির স্থানীয় নেতা তোফাজ্জল হোসেন শেখের বাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী তাণ্ডব চালায় সংঘবদ্ধ ডাকাতদল। সশস্ত্র অবস্থায় ঘরে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তারা স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

তোফাজ্জল শেখ বলেন, ডাকাতরা রাতে দরজা ভেঙে ঢুকে সবাইকে অস্ত্রের মুখে ফেলে। আলমারি-ড্রয়ার ভেঙে সব কিছু লুট করে নিয়ে গেছে। আমার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ লাখ টাকা। এমন ঘটনায় পরিবার-পরিজন নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।

এর আগে শনিবার (৯ আগস্ট) রাত আড়াইটার দিকে সদর উপজেলার ভবানীপুর দক্ষিণপাড়ায় ব্যারিস্টার কায়সার আহমেদের বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি হয়। রাত আড়াইটা থেকে ৪টার মধ্যে ১০-১২ জনের সশস্ত্র ডাকাতদল তালা কেটে ঘরে ঢোকে। একে একে প্রতিটি কক্ষের দরজা ভেঙে তারা পরিবারের সবাইকে হাত-পা বেঁধে ফেলে।

ভুক্তভোগী ব্যারিস্টার কায়সার জানান, ডাকাতরা ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সবাইকে কোণঠাসা করে ফেলে। নগদ ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ও প্রায় ১০ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। আমার মা, ছোট ভাই আর আমাকে মারধর করেছে। এখনো মানসিকভাবে আমরা ভীত।

শুধু নয়াপাড়া বা ভবানীপুর নয়, সম্প্রতি মির্জাপুর ও পিরুজালী ইউনিয়নেও একাধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই কৌশলে রাতের আঁধারে বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করছে ডাকাতদল।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, দিন-রাত উভয় সময়ই অপরাধ বাড়ছে। ভবানীপুর, মনিপুর, বাঘের বাজার, শিরিরচালা এলাকায় দিনের বেলা চুরি ও ছিনতাই আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। অর্থাৎ মানুষ ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নয়, আবার বাইরে বের হলেও ঝুঁকি এড়ানো যাচ্ছে না।

ভবানীপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, আমরা শিশুদের একা স্কুলে পাঠাতে পারি না। মেয়েদের হাতে মোবাইল বা স্বর্ণালঙ্কার থাকলে টার্গেট হয়। রাতে ডাকাত আতঙ্ক, দিনে ছিনতাই’ এ যেন মৃত্যুকূপে বসবাস।

জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদ আহমেদ গত সোমবার (২৫ আগস্ট) থানার হল রুমে ওপেন হাউজ ডে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনবল কম থাকায় সব এলাকায় টহল জোরদার করা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ডাকাতির ঘটনায় তদন্ত চলছে। পাশাপাশি মাদক বিক্রিসহ নানা অপরাধও নজরদারি করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু তদন্ত নয়, দ্রুত গ্রেফতার ও দৃশ্যমান টহল চাই। তারা মনে করেন, পুলিশ যদি ঘটনার পরেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে।

স্থানীয় এক সচেতন নাগরিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডাকাতরা প্রতিদিনই জয়দেবপুর থানাধীন এলাকায় হামলা চালাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে বড় বড় বাড়ি লক্ষ্য করছে, আবার অন্যদিকে দিনের বেলায় রাস্তায় ছিনতাই করছে। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলে পুলিশের তেমন কোন ভূমিকা দেখা যায় না।

ভুক্তভোগীরা দাবি জানিয়ে বলেন, ঘটনাগুলোর দ্রুত তদন্ত ও আসামি গ্রেফতার, প্রতিটি হটস্পট এলাকায় রাতভর টহল জোরদার, থানাভিত্তিক প্রতিটি এলাকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া টিম গঠন, স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি সেফটি নেটওয়ার্ক চালু করা।

জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদ আহমেদ বলেন, সম্প্রতি ডাকাতি মামলার তদন্তে আমরা ভবানীপুরের গুচ্ছগ্রাম থেকে আনোয়ার হোসেন (২৫) নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে জয়দেবপুর ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিগঞ্জসহ বিভিন্ন থানায় ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধের একাধিক মামলা রয়েছে। আমরা মামলাটির তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছি এবং চক্রের অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

স্থানীয়রা বলছেন, জয়দেবপুর থানাধীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্রমেই উদ্বেগ বাড়ছে। রাতের বেলা ডাকাতির পাশাপাশি দিনের বেলা চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় জনজীবন আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন—ঘরে থেকেও নিরাপদ নয়, বাইরে বের হলেও ঝুঁকি এড়ানো যায় না। তাই পুলিশের দ্রুত টহল ও নজরদারি বাড়ানোর দরকার। এছাড়াও আসামীদের গ্রেফতার করে দ্রুত বিচারের দাবী জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *