
রাজনীতির রঙ বদল করে অপরাধ আড়াল করার নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছেন গাজীপুরের আলোচিত ব্যক্তি সাখাওয়াত হোসেন। এক সময় আওয়ামী লীগের ব্যানারে ক্ষমতার জোরে জমি দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী এই ব্যক্তি বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তবে রাজনৈতিক ব্যানার বদলালেও তার অপকর্মের ধারা থেমে নেই—বরং আগের চেয়ে আরও সংগঠিত ও কৌশলী হয়ে উঠেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক একাধিক অভিযোগ ও সংবাদ সম্মেলনে উঠে এসেছে, সাখাওয়াত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের বাঘের বাজার, বানিয়ারচালা ও শিরিরচালা এলাকায় সাধারণ মানুষের জমি দখল, ভয়ভীতি ও হামলা চালিয়ে আসছেন। নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিলেন।
পরে ৫ই আগস্ট এর পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে কৌশলী হয়ে চালিয়ে যায় তার অপরাধের কর্মকান্ড। এসব কর্মকান্ড প্রকাশে এলে নিজেকে রক্ষা করতে করছেন সংবাদ সম্মেলন।
ভুক্তভোগী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “আমার ২৮ শতাংশ জমি সিএস-১২০, এসএ-৫৬৩ ও আরএস-২৪৯ নম্বর খতিয়ানে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে ছিল। সাখাওয়াত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখল করে নেয়।” অন্যদিকে রমজান আলী ও ফারুক হোসেন অভিযোগ করেন, “ভুয়া মামলা, হুমকি ও মারধরের মাধ্যমে আমাদের বৈধ জমি দখল করে রাখা হয়েছে। এলাকায় তার ভাড়াটে বাহিনী মাদক, চুরি, ছিনতাইয়ে জড়িত।”
১ জুলাই এক পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা। আমি বিএনপিপন্থী ভূমিদস্যুদের ষড়যন্ত্রের শিকার।” তবে তার বক্তব্যে ছিলো তথ্য বিভ্রাট ও রাজনৈতিক চাতুর্যের স্পষ্ট ছাপ। একদিকে তিনি নিজেকে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ দাবি করেন, অন্যদিকে তার ফেসবুক প্রোফাইলে ২০১৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণের ছবি এখনো দৃশ্যমান। এমনকি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে ছবি ছাপিয়ে নিজের রাজনৈতিক আনুগত্য প্রমাণের চেষ্টাও করেছিলেন তিনি।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো— বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন এবং বর্তমানে তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। যে ব্যক্তি ৫ আগস্টের পর পুলিশ দেখলে গা ঢাকা দিতেন, সেই ব্যক্তি এখন জামায়াতপন্থী পরিচয়ে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের মুখোশ বদলে তিনি আবারও নতুন প্রভাব বিস্তার শুরু করেছেন।
সাখাওয়াত হোসেনের পরিচয় শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, তিনি গাজীপুরে এক ভয়ংকর ‘টাকার কুমির’ হিসেবেও পরিচিত। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় প্রভাব খাটিয়ে বিপুল অর্থ সম্পদ অর্জন করেন। সেই টাকায় গড়ে তুলেছেন একটি সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা এলাকার জমি দখল, ব্যবসায়ীদের চাঁদাবাজি ও সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহার হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতি, মাদক, চুরি, জমি দখলসহ একাধিক মামলা রয়েছে, যেগুলো এখনো চলমান। তার লোকজন একাধিকবার র্যাব ও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেন সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে দাবি করলেও এলাকাবাসী বলছেন ভিন্ন কথা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছু স্থানীয় একজন বলেন, “সাখাওয়াত হোসেন এলাকার ভয়ঙ্কর লোক। তার লোকজন নিয়ে জমি দখল, মারধর আর সন্ত্রাস চালায়। সে এখন জামায়াতে গিয়েও একই কাজ করছে।”
সাখাওয়াত হোসেন ও তার বাহিনী শুধু জমি দখলেই থেমে নেই। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ফেসবুক পোস্ট দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
ভুক্তভোগী পরিবার স্থানীয়রা প্রশাসনের উর্ধ্বতন মহলের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন—সাখাওয়াত হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। এছাড়া, তার অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের একটি অংশকে ব্যবহারের চেষ্টাও যেন ব্যর্থ হয়, সেই বিষয়েও সতর্কতা জরুরি।
সাখাওয়াত হোসেনের মতো ব্যক্তি রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কেবল নিজের অপরাধ ঢাকতেই নয়, বরং নতুন করে তা বিস্তারের সুযোগ নিচ্ছেন। এমন ব্যক্তি একেক সময় একেক দলের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি কেড়ে নিচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে, ভবিষ্যতে এর চেয়েও বড় দুর্যোগ নেমে আসতে পারে এলাকার শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনে।
