হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে ফসলের মাঠ: শার্শায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সরিষা আবাদ

বর্তমান বাংলাদেশ ডেস্ক

print news

বেনাপোল প্রতিনিধি: যশোরের শার্শা উপজেলা জুড়ে সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। ফসলের মাঠের হলুদ রাজ্যে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত পরিবেশ। মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের অপরূপ দোলাচালে কৃষকের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে আনন্দের হাসি। শীতের সকালের নরম রোদে উপজেলার মাঠগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। যতদূর চোখ যায়, শুধু হলুদ আর হলুদ। বিস্তীর্ণ মাঠ দেখে মনে হয়—প্রকৃতি যেন নিজ হাতে বিছিয়ে দিয়েছে হলুদের চাদর। বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের ফাঁকে মৌমাছির গুনগুনানি আর মাঠের আইলে কৃষকদের মুখে একরাশ আশা—এ যেন শুধু ফসলের মাঠ নয়, কৃষকের স্বপ্নের রাজ্য।

একসময় লাভ না হওয়া ও পরপর লোকসান গুনতে থাকায় শার্শায় সরিষা চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন অনেক চাষি। তবে গত বছর স্থানীয় বাজারে উন্নত জাতের সরিষার দাম ভালো পাওয়ায় এবার কৃষকরা আবারও সরিষা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিনামূল্যে পাওয়া উচ্চফলনশীল জাতের বীজও কৃষকের আনন্দ বাড়িয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছর শার্শায় প্রায় ৫,৯২৯ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ৮,৯২৯ মেট্রিক টন, অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ১.৫১ মেট্রিক টন। এ বছর কৃষি বিভাগের উদ্যোগে সরিষা আবাদে কৃষকরা আরও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬,৫০২ হেক্টর জমিতে। ইতোমধ্যে পুরো লক্ষ্যমাত্রার জমিতেই বপন সম্পন্ন হয়েছে, আরও কিছু কৃষক চাষ করছেন। ফলে এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে সরিষা আবাদ হবে বলে কৃষি বিভাগের ধারণা।

কৃষকদের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ মৌসুমে বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবার উপজেলার এক হাজারের বেশি কৃষক সরিষা চাষ করেছেন। ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, সরিষা, আলু, সূর্যমুখী, পাট, তিলসহ বিভিন্ন ফসল চাষেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ভোজ্যতেলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আমদানি নির্ভরতা কমাতে কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় আগামীতে আরও সরিষা আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

উপজেলার বিভিন্ন সরিষাক্ষেত ঘুরে দেখা যায়—মাঠ যেন সবুজের গায়ে হলুদের আল্পনা এঁকে দিয়েছে। হলুদ ফুলে ভরে গেছে পুরো মাঠ। দিগন্তজোড়া হলুদের সমারোহে মৌমাছির গুনগুনানিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শে শার্শা, বাগআঁচড়া, বেনাপোল, পুটখালি, বাহাদুরপুর, নিজামপুর, ডিহি, লক্ষণপুরসহ সব ইউনিয়নের অনেক কৃষক পাঁচ থেকে ছয় বিঘা করে জমিতে উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা চাষ করেছেন।

এ বছর দুই বিঘা জমিতে বারি-১৪ ও বিনা-৯/১০ জাতের সরিষা চাষ করেছেন শ্যামলাগাছী গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, “প্রতি বিঘায় চাষে খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। বাজারে চাহিদা ও দাম দুটিই ভালো থাকে। এবার গাছ, ফুল-ফল সবই ভালো হয়েছে। আশা করছি বাম্পার ফলন হবে। গত বছরের মতো লাভবান হতে পারবো।

বালুন্ডা গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, “সরিষার চাহিদা ভালো ও ক্ষতির ঝুঁকি কম থাকায় প্রতি মৌসুমেই সরিষা চাষ করি। আশা করছি এবারও দাম ভালো পাবো। দাম ভালো হলে আগামী বছর আরও অনেকে সরিষা চাষে আগ্রহী হবে।

বেনাপোলের নারায়নপুর এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “বারি-১৪ জাতের সরিষার গাছ লম্বা হওয়ায় এর পাতা ঝরে পড়ে মাটিতে জৈব সারের কাজ করে। এরপর একই জমিতে বোরো চাষে সারের পরিমাণ কম লাগে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবার দুই বিঘায় উন্নত জাতের সরিষা চাষ করেছি।

গোগা গ্রামের নাজমুল বিশ্বাস বলেন, “এবছর নতুন করে সরিষা চাষ শুরু করেছি। কৃষি অফিস থেকে বারি-১৪ জাতের বীজ নিয়ে দুই একর জমিতে রোপণ করেছি। গাছ ও ফুল দেখে মনে হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এবার দ্বিগুণ ফলন হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, “কৃষকদের যথাযথ পরামর্শ ও পরিচর্যার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে বারি-৮, বারি-১৪, বারি-১৭, বারি-১৮, বিনা-৪, বিনা-৯ জাতের বীজ সরবরাহ ও বিতরণ করা হয়েছে। বারি-১৪ জাতের সরিষা বপনের মাত্র ৭৫–৮০ দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। দ্রুত ফলন ও পরবর্তী সময়ে বোরো আবাদে সুবিধা থাকায় কৃষকরা একে ‘লাভের ফসল’ হিসেবে দেখছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর ভালো ফলন হবে।

তিনি আরও বলেন, “বারি-১৪ জাতের গাছ লম্বা হওয়ায় এর পাতা মাটিতে পড়ে জৈব সারের কাজ করে এবং জমির উর্বরতা বাড়ায়। এর পর বোরো আবাদে সারের পরিমাণ কম লাগে। তাই কৃষকদের এসব জাত চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন উপকরণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।