
ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ধারাভাষ্যাকার টনি কোজিয়ার একবার বলেছিলেন, বোলার কোর্টনি ওয়ালশের চেয়ে ব্যাটসম্যান কোর্টনি ওয়ালশকে তিনি বেশি উপভোগ করেন। যেই মানুষটি টেস্ট ইতিহাসে প্রথম ৫০০ উইকেট পেলেন আর ব্যাট হাতে ছিলেন একেবারেই ঠুঁটো জগন্নাথ, তার সম্বন্ধে এ কী ধরনের কথা!
কোজিয়ার কারণটা খুলেও বলেছিলেন। তর্ক সাপেক্ষে টেস্ট ইতিহাসে সেরা ইনিংসটা খেলেছিলেন ব্রায়ান লারা। সর্বজয়ী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে চতুর্থ ইনিংসে ৩১২ রান তাড়া করতে গিয়ে ১৫৩ রানের এক অনবদ্য ইনিংস। পাঠককে এখানে জানিয়ে রাখি, ২৫ বছর আগের সেই ইনিংসটার কথা মনে করতে গিয়ে দেখি টাইপরত দুটি হাতের রোমক‚পগুলো সব দাঁড়িয়ে গেছে। যারা সেই ইনিংস দেখেছেন তাদের এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু, সেই ইনিংসে ওয়ালশের ‘শূন্য’তে অপরাজিত ইনিংসটার অবদান কি ভোলা সম্ভব?
যেই লোকটার ব্যাটিং নিয়ে সারা জীবন হাসাহাসি হতো, সেই তিনি পাঁচ পাঁচটা বল ঠেকিয়ে দিলেন। সেদিন যদি তিনি আউট হতেন, তবে লারার ইনিংসটার মাহাত্ম্য থাকত না, স্থান পেত বড়জোর ক্রিকেট ইতিহাসের অতি ছোট কোনো পাদটীকা হিসেবে। এই কারণে, ওয়ালশের ঠেকানো প্রতিটা বল ব্রিজটাউনে যে তালি পেয়েছিল তা লারা গোটা ইনিংস জুড়ে পাননি।
আর এখানেই সেই আলাপটা। ক্রিকেটের আরও সব অদ্বিতীয় ব্যাপারের মতো একটা বিষয় হচ্ছে, ব্যাট করতে না জানা বোলারদের ব্যাট হাতে নায়ক হওয়া। পেশাদার খেলা হলেও, যিনি বিশেষজ্ঞ নন তাকে তার দক্ষতার বাইরে গিয়ে দলকে বাঁচানোর চেষ্টা অর্পণ করার মতো। ঠিক যেন যুদ্ধক্ষেত্রে ট্রেনিংবিহীন একজন মানুষের বীরশ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠার মতো।
ওয়ালশকে ২৫ বছর পর মনে করিয়ে দিলেন আমাদেরই তরুণ হাসান মাহমুদ। এই যুগে ওয়ালশের মতো ‘এক বলের মালিক’ হওয়া কঠিন, কিন্তু মাহমুদের মূল পরিচয়টা বোলার হিসেবেই। খেলতে নেমেছিলেন জীবনের তৃতীয় টেস্ট। যে সময় প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নামেন, দলের অবস্থা অনেকটাই খারাপ। শোচনীয়তম ২৬-৬ থেকে দুই সুপার হিরো লিটন দাশ আর মেহেদী হাসান মিরাজ অনেকটাই উদ্ধার করেছেন। কিন্তু, তখনো দলের স্কোর পাকিস্তানের প্রথম ইনিংসের ২৭৪ থেকে ৮১ রান দূরে। উল্টো দিকে লারা হয়ে ওঠা লিটন তখনো ক্রিজে থাকলেও বোঝাই যাচ্ছিল প্রচন্ড গরমে কিপিং করার পর অনেকক্ষণ ব্যাট করে তিনি বেশ ক্লান্ত। ফলে, আর দুইটা দ্রুত আউট খেলার নিয়ন্ত্রণ স্বাগতিকদের হাতেই তুলে দিত।
কিন্তু, সে সময় মাহমুদের ব্যাট ত্রাতা হয়ে উঠল। একের পর এক বল ঠেকিয়ে লিটনকে সঙ্গ দিলেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান দেশের টেস্ট ইতিহাসে সেরা ইনিংসটা খেললেন, ১৩০ রান করে দলকে রক্ষা করলেন। কিন্তু, মাহমুদের ৫১ বলের হার না মানা ইনিংসটা! সেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞা না থাকলে কি লিটন আর বাংলাদেশ পারত খেলায় ফিরতে?
শুধু কি তাই? সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে ওয়ালশ যেমন পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন, আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা মাহমুদ তাই করলেন। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিত পরাজয়ের ম্যাচকে জয়ের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন।
মজার ব্যাপার, এখানে সমস্ত কৃতিত্ব মাহমুদের হলেও তার বোলিং সঙ্গীটির কথা না বললেই না। নাহিদ রানা। বয়স মাত্র ২১। মাহমুদের মতোই তৃতীয় টেস্ট। এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় কবিতার মতো নাহিদ জানেন, এই বয়সটা পেসের, গতির, উত্তেজনার। আর প্রকৃতির কি অদ্ভুত লীলাখেলা! এক সময় যে পাকিস্তানে গলিতে গলিতে স্পিডস্টাররা জন্মাত সেই পাকিস্তানের মাটিতে এক বাংলাদেশি কি না ত্রাস হয়ে উঠলেন।
যেই বাংলাদেশিদের ভেতো বাঙালি বলে পাকিস্তানিরা তুচ্ছ করত। যাদের দিয়ে ক্রিকেটটা হবে না বলেই মানত, যেই দেশের লাখো লাখো মানুষকে হত্যা করেছিল শুধু দেশ দখলের নেশায়। তাদেরই এক দুরন্ত যুবক চেরি হাতে ওদের কাঁপিয়ে দিল। রাজনীতির বাজে চর্চায় মুক্তিযুদ্ধকে কলুষিত করা হয়েছে, পাকিস্তানিদের জঘন্য যুদ্ধাপরাধ ও জাতঘৃণাকে পর্যন্ত এদেশে লঘু করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘাঁটি রাওয়ালপিন্ডিতেই একজন নাহিদ যেন সুকান্তের মতো বলে বসেন আদিম হিংস্র মানবতার যদি আমি কেউ হই।
নাহ, ক্রিকেটকে মুক্তিযুদ্ধ বানানোর ভুল করার সুযোগ নেই। ক্রিকেট একটা খেলাই। এটা ঠিক, আধুনিক যুগে ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস জাতিগত গৌরবের একটা মাপকাঠি। স্পোর্টসের সাফল্য গোটা জাতিকে উদ্বেলিত, উদ্দীপ্ত করে। কিন্তু, একে জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার করার বিপদটাও আমরা টের পেয়েছি। এরপরেও, একজন বাংলাদেশি পাকিস্তানের মাটিতে ১৫২ কিলোমিটার বেগে বল করে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, এই ব্যাপারটার যে মানসিক শক্তি, তা এড়ানোর উপায় নেই।
এই শক্তি আমাদের তরুণদের জন্য দারুণ স্পৃহা নিয়ে আসবে। যেই তরুণরা দেশের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিল তাদের বিশ্বাস জোগাবে। আমরা কারও থেকে কম নই, আমাদেরও সামর্থ্য আছে সেরাদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার।
তবে, সেরা হওয়াটা একদিনের ব্যাপার না। একটা ম্যাচ কিংবা একটা সিরিজের ব্যাপারও নয়। এই জিনিসটা চর্চার, ধারাবাহিকতার। যে কারণে, খেলায় জেতার পর, সিরিজ জেতার পর বুনো উল্লাসের বদলে পরিমিত উচ্ছ্বস ব্যাপারটা দারুণ প্রশংসনীয়। যেই বাংলাদেশ আগে একটা ওয়ানডে ম্যাচ জিতলেই দেশব্যাপী মিছিল করত সেই বাংলাদেশ শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জিতে মিছিল করে না, গণহারে মিষ্টি বিলায় না। এই বাংলাদেশ জয়কে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে মাটিতে পা রাখতে চায়। সাবধানে এগোতে চায়।
দেশের মানুষের অনবদ্য জয়ের মুকুটে ক্রিকেটীয় পালক যোগ হওয়ার পর নতুন বাংলাদেশও সেভাবেই আগাবে। এদেশের মেহনতি, খেটে খাওয়া, স্বপ্নবাজ মানুষদের নিয়ে।
