
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধ: কুড়িগ্রাম পৌর শহরের চর হরিকেশ। শহরের কাছাকাছি এই জনপদে দিনের ব্যস্ততা শেষ হলেই বাড়ে নানা ধরনের উৎকণ্ঠা। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদকের ব্যাপক বিস্তার রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। হাতের নাগালে হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের কেনাবেচা ও সেবন চলে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মাদকের প্রভাবে তরুণ প্রজন্ম বিপথে যাচ্ছে—এমন আশঙ্কা করছেন অভিভাবকেরা।
সম্প্রতি মাদকবিরোধী কার্যক্রমের জের ও প্রতিহিংসার কারণে জেলা মাদক প্রতিরোধ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, দৈনিক কালবেলার কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি সাইয়েদ আহমেদ বাবুর শ্বশুর ৮০ বছর বয়সী রোস্তম আলী খোকাকে প্রকাশ্য সড়কে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় হরিকেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকালে চর হরিকেশ এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় আব্দুল জলিল নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশে দেন স্থানীয়রা। পরবর্তী সময়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হরিকেশে মাদকের বিস্তার নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরে মাদকসেবীদের আনাগোনা এবং মাদককেন্দ্রিক নানা অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। তাদের দাবি, মাদকের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
প্রবীণ রোস্তম আলী খোকা হত্যার পর স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে মাদক নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্থানীয়রা বলেছেন, এলাকায় মাদকের বিস্তারের কারণে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েছে এবং তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
গত ৩০ আগস্ট রাতে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার আগমনী বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে চর হরিকেশের বাসিন্দা মো. আবু লাইচ শামসুদোহা শাওনকে ৮০ পিস নিষিদ্ধ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয় এবং আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ছাড়া আগস্টে কুড়িগ্রাম এলাকায় পৃথক অভিযানে ১০ কেজি গাঁজা উদ্ধার ও দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও জানিয়েছিল জেলা পুলিশ।
অর্থাৎ, মাদকবিরোধী অভিযান একেবারেই নেই, তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে—অভিযানের পরও মাদকের এমন প্রভাব কমছে না কেন?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদকসেবীদের পাশাপাশি মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন। তবে স্থানীয়ভাবে যেসব ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন প্রমাণ বা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার তথ্য ছাড়া তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
এলাকাবাসীর দাবি, মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে নিরীহ কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হরিকেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। তাদের আশঙ্কা, মাদকের সহজলভ্যতা ও অপরাধপ্রবণ পরিবেশ তরুণদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মাদকবিরোধী সচেতনতা, খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি, তরুণদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগও প্রয়োজন।
মাদকের কারণে শুধু রাস্তাঘাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নয়, পারিবারিক জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাদকাসক্ত সদস্যের কারণে পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ, দাম্পত্য কলহ ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি এলাকায় মাদক ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব কোনো একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে তা পুরো এলাকার সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
রোস্তম আলী খোকা হত্যার পর হরিকেশে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি প্রশাসনের মাদকবিরোধী অভিযান আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, মাদকের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিয়মিত নজরদারি থাকবে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হরিকেশের পরিচয় মাদকের আখড়া হিসেবে নয়, বরং একটি নিরাপদ আবাসিক এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।
চর হরিকেশের বাসিন্দা ও হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী মো. এরশাদুল হক (৩২) বলেন, “আমি ঘটনার সময় পাশেই ছিলাম। অন্যদিনের মতো রোস্তম আলী ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে বের হয়ে এই মোড়ে এসে চা খান। সেদিনও চা খেয়ে বের হওয়া মাত্র জলিল দৌড়ে এসে তার বুকে ছুরি মেরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমরা পাশের লোকজন তাকে ধরে ফেলি এবং পুলিশে দিই। আমার জানামতে, নিহত রোস্তম আলী একজন ধার্মিক ও ভালো মানুষ ছিলেন। তার কোনো শত্রু ছিল না। হত্যাকারী জলিল একজন মাদকসেবী ছিলেন—এটা এলাকার সবাই জানেন। আমরা এই নির্মম হত্যার বিচার চাই এবং এলাকাকে মাদকমুক্ত করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই।”
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ (৩৪) বলেন, “শুধু মাদকের বিরুদ্ধে মুরব্বি রোস্তম আলী চাচা মানুষকে নসিহত করতেন। এমনকি ওই খুনি জলিলকেও মাদক ছেড়ে ভালো পথে আসতে বলতেন, নামাজ পড়তে বলতেন। আর এটাই ছিল মুরব্বির অপরাধ। এ কারণেই তাকে প্রাণ দিতে হলো। আমি এই হত্যার বিচার এবং এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানাই।”
হরিকেশের কানি পাড়া এলাকার মো. আক্কেল আলী (৬৮) বলেন, “এলাকায় মাদক নির্মূলের জন্য আমরা মসজিদভিত্তিক কমিটি করে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। দুঃখজনক হলেও সত্যি, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন আমাদের সহায়তা করছে না। আমরা এলাকাবাসী প্রশাসনের কাছে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই। তা না হলে আমরা এলাকাবাসী রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলব।”
জেলা মাদক প্রতিরোধ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, “এটি পরিকল্পিত হত্যা। আমি নিজে মাদকবিরোধী কার্যক্রম করে আসছি। ফলে প্রতিহিংসার কারণে আমার শ্বশুরকে মাদকসেবী জলিল নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমি চাই না, আর কেউ এমন প্রতিহিংসার কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হোক।” তিনি প্রশাসনের কাছে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রোস্তম আলী খোকা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার তথ্যও নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।