
গাজীপুর প্রতিনিধি : গাজীপুরে সরকারি খাসজমি ও সংরক্ষিত বনভূমি দখলের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার দাবি করা দৈনিক নয়া দিগন্তের জয়দেবপুর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে এবার আদালতে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। মামলায় সাংবাদিকের পাশাপাশি তার বৃদ্ধ বাবা মো. আব্দুর রব ও মা ছকিনা বেগমকেও আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিক মহলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আরাফাত হোসেন রাসেল বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৩৮৫, ৩৮৬, ৫০৬ (দ্বিতীয়) ও ৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, গত ২৫ জুন সাংবাদিক আব্দুল আজিজ তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। পরে ১০ হাজার টাকা গ্রহণের সময় স্থানীয় লোকজন বিষয়টি জানতে পেরে টাকা উদ্ধার করেন এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সাংবাদিক আব্দুল আজিজ। তিনি বলেন, সরকারি খাসজমি ও সংরক্ষিত বনভূমি দখলের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন। চিকিৎসা শেষে জয়দেবপুর থানায় হামলা ও অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে মামলা করলেও আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। পরে তারা আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তার ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন।
আব্দুল আজিজের দাবি, রাষ্ট্রীয় খাসজমি ও বন বিভাগের সংরক্ষিত সম্পত্তি রক্ষার স্বার্থে তিনি তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান করছিলেন। এ কারণে তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। পরে তার পকেটে টাকা ঢুকিয়ে ভিডিও ধারণের মাধ্যমে চাঁদাবাজির অভিযোগ সাজানোর চেষ্টা করা হয়। এতে ব্যর্থ হয়ে তাকে অপহরণেরও চেষ্টা করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, হামলা ও অপহরণের চেষ্টার মামলার পর আসামিরা জামিনে মুক্ত হয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন এবং রাজি না হলে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তার বৃদ্ধ বাবা-মাকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। তার ভাষ্য, ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই; তাকে ভয় দেখানো ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই তাদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে, সব অভিযোগ অস্বীকার করে আরাফাত হোসেন রাসেল বলেন, তিনি ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক এবং রড-সিমেন্ট ব্যবসা ও ঠিকাদারির সঙ্গে জড়িত। তার দাবি, বন বিভাগের সীমানা-সংক্রান্ত একটি নির্মাণকাজ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য আব্দুল আজিজ তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। পরে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন ভিডিও ধারণ করেন।
সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগও অস্বীকার করেন রাসেল। তিনি বলেন, “আমরা তাকে মারধর করিনি। তিনি নিজেই সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে যান। পরে হাসপাতালে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।”
উল্লেখ্য, এর আগে সরকারি খাসজমি দখলের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলা ও অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে আব্দুল আজিজ জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় আরাফাত হোসেন রাসেল প্রধান আসামি। পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরা হামলার অভিযোগ এবং পাল্টা মামলাসহ পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, উভয় পক্ষের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গাজীপুর প্রেসক্লাবের তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর সদস্য ও সাংবাদিক ইউনিয়ন গাজীপুরের সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “একজন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধেই মামলা হওয়া উদ্বেগজনক। কোনো সাংবাদিক অপরাধ করলে অবশ্যই আইনের আওতায় আসবেন। তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে যদি হয়রানিমূলক মামলা করা হয়ে থাকে, তাহলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অশনিসংকেত।”
তিনি বলেন, “আমরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। হামলার অভিযোগ, পাল্টা মামলা এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
