
পাবনা সুজানগর সংবাদদাতা : ১৭ জানুয়ারি, সাহিত্যাঙ্গনের এক উজ্জল নক্ষত্র কবি বন্দে আলী মিয়ার জন্মদিন। এই দিনে পাবনা জেলা শহরের রাধানগর মহল্লার উমেদ আলী মিয়া ও মা নেকজান নেছার কোলজুড়ে আসেন কবি বন্দে আলী মিয়া।
শহরের রাধানগরে কবির বসতভিটা ‘কবিকুঞ্জ’ জীর্ণশীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। জেলাবাসী তথা কবির অনুরাগী ভক্তদের মধ্যে এ নিয়ে নানা ক্ষোভ রয়েছে। তাদের দাবি, বাড়িটি সংস্কার করে কবির রেখে যাওয়া কর্ম-স্মৃতিগুলোর সংরক্ষণ করে একটি আর্কাইভ করা দরকার।
শহরের রাধানগর মহল্লায় কবির শৈশব-কৈশর কাটে। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে কবি বন্দে আলী মিয়া পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের পাশে রাধানগর মজুমদার একাডেমি (আর.এম একাডেমি) থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বউ-বাজারে ইন্ডিয়ান আর্ট একাডেমি থেকে চারুকলায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে কাজের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ২০ বছর চাকরি করার পর ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। কবি বন্দে আলী মিয়া কলকাতা, ঢাকা ও রাজশাহী এ তিনটি স্থানেই কাজ করেছেন সারাজীবন। 'চোরজামাই' শিশুতোষ বইটি লিখে কবি হিসেবে তিনি প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটান।
কবি বন্দে আলী মিয়া ছিলেন একাধারে গীতিকার, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও অসংখ্য শিশুতোষ সাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভাধর সাহিত্যিক।
বিভিন্ন লেখক কবি বন্দে আলী মিয়াকে বিশিষ্ট বিদেশি সাহিত্যিকদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, তিনি মুখে মুখে গল্প বলায় যথেষ্ট পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন।
তিনি তিরিশ-চল্লিশ দশকের প্রথম তিরিশ বছর কলকাতায় অবস্থান করেছেন। এই সময়ে কবি বন্দে আলী মিয়া কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ বরেণ্য সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সূত্রে তিনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
কবি বন্দে আলী মিয়ার প্রথম কাব্য ‘ময়নামতির চর’ ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বন্দে আলী মিয়ার শিশুতোষ গ্রন্থের সংখ্যা ১০৫টি এবং অন্যান্য বিষয়ে লেখা বইগুলো যোগ করলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৬টি'তে।
কবি জীবনের শেষ দিকে বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি সময় সুযোগ পেলেই শিশুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠতেন। কবি বেতারে কাজ করার সময় ছোটোদের আসর ‘সবুজ মেলা’ পরিচালনা করতেন এবং তিনি ‘গল্প দাদু’ নামে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি বেতারে ‘ছেলে ঘুমালো’ অনুষ্ঠানের জন্য প্রায়ই নতুন নতুন গল্প রচনা করতেন।
বরেণ্য প্রতিভার অধিকারী পাবনার সন্তান কবি বন্দে আলী মিয়া ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৭শে জুন রাজশাহীর কাজিরহাট অঞ্চলের নিজ বাসভবনে সকাল ১১টা ১০ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে কবি বন্দে আলী মিয়ার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।
কবির নিজ জেলা পাবনায় কবি বন্দে আলী মিয়া স্মরণ পরিষদ, কবি বন্দে আলী মিয়া শিশু একাডেমি গড়ে তোলা হলেও কার্যত তা সক্রিয় নয়। তবে তার নামে জেলার আটঘরিয়া উপজেলার দেবোত্তরস্থ কবি বন্দে আলী মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি পাবনা পৌরসভা তার নামে একটি সড়কের নামকরণ করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি তার নামের করা হয়েছে।